মলয় রায়চৌধুরী

মলয় রায়চৌধুরী

সোমবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০২০

উনি

 

উনি


কাছাকাছি এসে পড়েছেন উনি, যাকে লোকে বলে অত্যন্ত নিকট

আমরা তাই বুড়ো-বুড়ি ষড় করে খেয়ে নিচ্ছি যা-কিছু বারণ

বুড়ির রক্তে শর্করা-ছোকারারা বেপরোয়া নেচেই চলেছে

পেচ্ছাপে চিনি পেয়ে শুঁড় উঁচিয়ে দল বাঁধে পিঁপড়ে-বিনুনি

হাঁটুর কোমরের হাড়ে ব্যথা যখন-তখন গোঁৎ খায়

বুড়ি খেয়ে নিচ্ছে আতা লিচু আম সবেদা আনারস

ব্ল্যাক ফরেস্ট আইসক্রিম সুইট ডিশ লাঞ্চ ও ডিনারে 

আলুদ্দম ডিমের ডালনা বিউলির মৌরি-বাটা ডাল

আমার হৃদয়ের অলিগলি জুড়ে ক্বাথমাখা যত্তো মাস্তান

ফুসফুসে ডিজেলের কৃষ্ণ তো কোন ছার রাধাও কালো

খেয়ে নিচ্ছি ঘিয়ে ভাজা আলুর পরোটা , ফাস্টফুড,

কলিজা, নেহারি, চিংড়ি, কেক, পেস্ট্রি, পুডিং, সমোসা

শৈশবে যা-কিছু খাইনি বা খেতে পাইনি আমরা দুজন

এখন তা খেয়ে নিচ্ছি দ্বিধাহীন যথেচ্ছ মিটিয়ে আশ 

জানি উনি প্র্যাকটিস করছেন আমাদের টার্গেট করে



তালুতে ওড়ানো চুমু

 

তালুতে ওড়ানো চুমু


শেষ যাত্রা আঁচ করে তালুতে ঠোঁট রেখে ওড়াচ্ছ চুমু নিরুপমা

জানো না বোধহয় ভালোবাসা পেলে শবও প্রাণ ফিরে পায়

কাঁটাতার-ফাটাতার কিচ্ছু মানবো না তোমাকে পাবার জন্য

পাসপোর্ট-ভিসা আর সিআরপিএফ বিডিআর বাধা মানবো না

উঠে বসব, লাফ দিয়ে নামবো শবখাট থেকে জড়াতে তোমাকে

আমার শীতল দেহ তপ্ত হয়ে উঠবে তোমার ভালোবাসা পেয়ে

ভালোবাসা কিচ্ছু মানে না, বয়স-ধর্ম-দেশ-সীমান্ত নিষেধ

তোমার ওড়ানো চুমু আমার হাত দুটো ডানা করে তোলে

তোমাকে নিয়েই উড়বো নিরুপমা, যতোদিন ব্রহ্মাণ্ড আছে



শুক্রবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২০

ইহ তিষ্ঠ ইহ তিষ্ঠ

 

ইহ তিষ্ঠ ইহ তিষ্ঠ


জেঠার সাইকেলের পেছনে বসে যেতুম ছুটিছাটায়

পাটনা মিউজিয়ামে এঘর ওঘর সেঘরে ধবধবে ফসিল

থেকে মুগুরধারী গুহামানুষের ল্যাংটো দল থেকে

সোনা-রুপোর মুদ্রাকড়ি থেকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য থেকে 

প্রবাল চুনী পান্না পোখরাজ গোমেদ ইন্দ্রনীলা মুক্তো

পদ্মনীলা বৈদুর্যমণি ফিরোজা চন্দ্রকান্তমণি ফিরোজা

আকিক ঝিউড়ি আর বউরা বারবার এসে দেখে যায়

আগ্নেয় পাললিক রূপান্তরিত পাথর পোড়া মাটির মূর্তি

কনকনে ঠাণ্ডায় হেলে-বসে-দাঁড়িয়ে রয়েছেন বুদ্ধ

অপ্সরার দল আর কে জানে কোন পাথরের ধুলোপড়া

মুণ্ডহীন এক পেশীপুরুষ যার লিঙ্গে টুক করে হাত বুলিয়ে

চলে যাচ্ছেন যুবতীরা এমনকি ঘোমটানশীন প্রৌঢ়া--

বছর বছর ধরে মেয়েলি হাতের পরশে চকচকে--মূর্তির

পাটাতনে লেখা, “ম্যাসিডোনিয়ার তৃতীয় আলেকজান্ডার” ।

আমি ভাবি, লোকটার মাথা নেই, কেমন করেই বা জাদুঘর

জানতে পেরেছে উনি আমাদের বইয়ের আলেকজাণ্ডার !

সে-কথাই জানতে চাই জেঠার ঘরে গিয়ে। ওনার টেবিলে রাখা

নানা জিনিসের মুণ্ডুর ভিড়ের ভেতর থেকে উঁকি দিয়ে বল্লেন,

“তোর যদি মুণ্ডু না থাকে, আমি কি জানব না ওটা তুই ?”


 
















বৃহস্পতিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২০

প্রেমের মজুর

 

প্রেমের মজুর


ক্রিজ নেই, জল-কাচা পোশাক বেশ দুঃখি মনে করে নিজেকে

এইখানে, আগ্রার দুর্গের দেয়ালে বাবা যে-মেয়েটির নাম

লিখে গিয়েছিলেন, আমার মা নয়

আমি লিখলে অনেক তরুণীর নাম লিখতে হবে

তাই কলেজ থেকে ট্যুরে গেলে, বিভিন্ন ধ্বংসস্তুপে

এক-একজনের নাম লিখে এসেছি

তাদের ছেলে-মেয়েরা এসে আমায় ধন্যবাদ জানিয়ে যায়

রাত্তিরকে শাশ্বত করে দিয়েছি সেসব দেয়ালে

প্রেমের ইচ্ছাশক্তি দিয়ে ; গরম আর ঠাণ্ডা শব্দ, বৃষ্টিতে ভেজে,

শ্যাওলা জমে । বাবা অরগ্যান বাজাতেন

তাঁর সুরের পালকগুলো নিয়ে আমি বেহালা শিখেছিলুম--

তার বাঁধতে শিখিনি, কাঁটাতার পেরোলেই সবুজ ধানখেতের দেশ

টিকটিকির ল্যাজে কতো শিল্পবোধ ; খসে যাবার পরও জীবন্ত

ছেঁড়া কবিতার বইয়ের মতন কবিকে নাড়ায়

ঈর্ষা আর যন্ত্রণার প্যাশন । স্বত্ত্ব ব্যাপারটা লালসা, বাবা জানতেন

মারা গেলেন যখন, তখন মারা যাননি, লোকেরা খবর পাবার পর

আসলে মারা গেলেন ; পৃথিবী অপার্থিব হয়ে গিয়েছিল

দুর্গের দেয়ালে লেখাছিল, “পেতে গেলে তোমায় বিয়ে করতে হবে

কিন্তু বিয়ে করতে চাই আরেকজনকে”, বাবার হাতের লেখা নয়--

সলতের কালোই আলোর কেন্দ্র ; প্রতিটি কথার শেষে হাসি

যেন খামে জিভ দিয়ে ইশারা সেঁটে দিলেন

চরিত্রের আভাস মেলে শরীরের ভাষা থেকে

মোড়ের মাঝখানে ব্রোঞ্জমূর্তি নিয়ে, তর্জনী তুলে বা নামিয়ে

কাকপ্রিয় মাথা নিয়ে উনি দাঁড়াতে চাননি--

ধ্বংসাবশেষের দেয়ালে-দেয়ালে প্রেমিকার নামকে 

নিজের নামের সঙ্গে বেঁধে রাখাই অমরত্ব

আর সেটাই তো প্রেমের বঁধুয়া মজুরের কাজ, জানতেন ।




বুধবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২০

সঙ্গী

 

সঙ্গী


কয়েকগাছা পাকাচুল-টাকমাথায় তোমার উষ্ণ তালু বুলিয়ে দিয়েছিলে তুমি

জীবনে প্রথম ও শেষবার ভালোবেসে নিয়েছিলে লোকটাকে

মারা গিয়ে তোমার স্বামী হয়ে-ওঠা লোকটাকে ইনসিনেটরে নিয়ে গেলে।

ছেলে তো বিদেশে - ডেকে পাঠিয়েছো, শ্রাদ্ধাদি আর

উত্তরাধিকারের আইনি কাজের জন্য ।

সঙ্গমের সময়ে চোখ বুজে থাকতে ; জানতে এ ওনার নিছক রুটিন

ঘুমোবার মাংস-ট্যাবলেট । অন্য নারীর গন্ধ পেতে ওঁর দেহে--

যাঁকে উনি সারাটা জীবন ভালোবাসলেন, তোমাকে লুকিয়ে--

উনিও জানতেন তুমি জানো ; ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে তুমি নেই

নমিনিও তুমি নও, বাড়ির দলিলে তুমি নেই

ওনার অস্তিত্বে কোথ্থাও ছিলে না ; সঙ্গী হতে দেয়নি লোকটা--

তুমি একা-একা তোমার কবিতা-খাতাকে স্বামী করে তুলেছিলে।

ভাগ্যিস কবিতায় আক্রান্ত হয়েছিলে ; নয়তো আজীবন

সঙ্গী-বর্জিত থেকে যেতে, একা, একা, একা, এক্কেবারে একা...



চুড়ি-টিপের মৃত্যু

 

চুড়ি-টিপের মৃত্যু

আররে শামিম ! তুই এই বাস-টারমিনাসে !

আব্বু-আম্মি আর বাড়ির সকলে কেমন আছেন পাটনায় ?

আমরা তো বছর দশেক হলো পাকিস্তানে চলে গেছি, বলল শামিম ।

পাকিস্তান ? কেউ তো বলেনি । আমিও বছর তিরিশ হল যাইনি পাটনায়।

আব্বুর তো চুড়ি-টিপ-আলতার দোকান ছিল, তোদের বাড়ির পাশে--

ক্রমশ খদ্দের আসা বন্ধ হয়ে গেল

যদিও মেয়েদের হাতে মাপ দেখে আম্মিই চুড়ি পরাতেন 

তুই তো জানিস, হিন্দু বিবি-বেটিরাই আমাদের দোকানে আসতো

এখন আর কেউই আসে না

আমরা তো মুসলমান, ওরা আসা বন্ধ করে দিলো

কীই বা করা যাবে, বল, আমি এসেছি ফুফাদের নিয়ে যেতে

ওদেরও চুড়ি-টিপ-চুনরির দোকান ছিল, জানিস তো তুই

পাকিস্তানে গিয়ে যে সুখে আছি, তা কিন্তু নয়

ওখানেও আমাদের ভিখারির দশা

কেউই ওদেশে চুড়ি-টিপ-আলতা পরে না

সোমবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০২০

প্রেমিকার মৃত্যু

 

প্রেমিকার মৃত্যু

মলয় রায়চৌধুরী

পা থেকে মাথা ওব্দি খিঁচুনি তুলে মারা গেলেন উনি 

নামকরা কবি, ওনার কবিতা শুনতে কতো যে লোকজন জড়ো হতো

মারা গেলেন আজকে সকালে একা, এক্কেবারে একা

বউ-ছেলে-মেয়ে বন্ধুবান্ধব শিষ্য কেউই ছিল না পাশে

মরবার সময়ে কি আশেপাশে আত্মীয়স্বজন কিংবা অন্তত

ছুটে এসে মুখে জল দিতে পারে এমনই কাউকে তো চাই

অথচ কেউই ছিল না, নামকরা কবি

মরার সময়ে এক তরুণীর মুখ উঁকি দিয়েছিল

যাকে উদ্দেশ্য করে সমস্ত প্রেমের কবিতা লিখে গিয়েছেন

.

কবি নয়, কবির প্রেমিকার মৃত্যু হলো

কবি তো নামকরা, ছাত্র-শিক্ষদের ক্লাসে আর

পরীক্ষা-খাতায় বহুকাল বেঁচে থাকবেন

প্রেমিকাকে তারা মনে রাখবে না