মলয় রায়চৌধুরী

মলয় রায়চৌধুরী

শুক্রবার, ১৯ আগস্ট, ২০১১

বিষবাউলের গান

মলয় মলয় মলয় মলয় মলয় মলয়
শুনতে শুনতে দেখতে দেখতে শুনতে শুনতে
এই নাম আর দেয়া যাবে না ছেলেকে নাতিকে
নামের ভেতর কোনো নরম নদীর নারী নেই
জোনাকি মালায় ওর হরিণীরা সঁপেনাকো গলা
শীতের হাওয়ায় নেই আমলোকি-পাতাদের নাচ
কী রেখেছে তাহলে ছাইপাঁশ ?
বানভাসি-ফেলে-যাওয়া ধানখেতে হাঁটু-ডোবা বালি...
আঁস্তাকুড়ে ফেলে-যাওয়া ভ্রুণ...
শুয়োরের পচা মাংস তেবাষ্টে হাঙরের নোনামাছ...


ফ্ল্যাট বিক্রি করে চলে যাচ্ছে এ-শহর ছেড়ে
৩৮৯৭ টি কবিতার বই বিলিয়ে দিতে চেয়েছিল
নেবার জন্য পাওয়া গেল না কাউকে
কবিতার বই রাখবে না কোনো গ্রন্হাগার
পাঠক নেই দেখভালে খরচ কে দেবে
জাতীয় গ্রন্হাগার কপিরাইট আইনে বই পায়
রাজ্য গ্রন্হাগার রাখে পার্টির লোকেদের বই
কারোর বাসায় অত জায়গা নেই তরুণ কবিদের
অতি ভালবাসা-মাখা কবিতার বই রাখবার তাক
মলাট বাদ দিয়ে কিলো দরে কিনতে রাজি
পোরোনো কাগজঅলা...প্রেম হাসি ক্রোধ সংবেদন
শতশত উপহার নেবার জন্য কোনো লোক নেই
পত্র-পত্রিকা জুড়ে হাজার হাজার সমালোচনার ঝাঁক
সবই ফালতু বুঝি ? মগজ ধোঁয়াটে হয়ে ওঠে
এত বই এত এত পত্রিকা কোথায় যাচ্ছে চলে ?
তিরিশের পর থেকে ? দুই বাংলা জুড়ে !
বাংলার টিচার ঠিক বাতলেছিলেন ক্লাসে:
টেকার জন্যে চাই কুখ্যাতি-দুর্নাম-বিষবাউলের গান
এ-সময় সে-সময় নয় : সে-সব বাউল আজ মৃত।


কাহার কুর্মি ডোম দুসাধের ছোটোলোক পাড়া
শৈশব কি গ্রন্হহীন ছিল ? কবির রহিম দাদু
তুকারাম থিরুভাল্লুভার রামচরিতের ছেঁড়া পাতা ?
এতটা আসার পর পিছন ফিরলে দ্যাখে
সেদিকে কিচ্ছু নেই, দিগন্তবিহীন পচা-ছেঁড়া-ছাতাপড়া
দশ-বিশ-হাজার টাকা নোটের দুর্গন্ধে টেকা দায়
কী হবে তাহলে ? সযত্নে আদরে রাখা কাব্যগ্রন্হগুলো ?
বাড়ি তো বিক্রি হবে চারদিন পর নতুন মালিক
বলেছেন: না না ওসব বই ফই গতি করুন
কারা পড়ে মশায় রবিঠাকুরই তো শুধু সাজেগোজে
তো আপনাদের এই বেআফিমি কারেস্তানি নেশা...
ওই তো মিউনিসিপালিটির জঞ্জালের ভ্যাট
কাগজকুড়ানিরা আসে দলবেঁধে সকালবেলায়
ক্যানিঙের ট্রেনে ভাড়া লাগে না কারোর


বাবা বারণ করতে পারতেন মা বারণ করতে পারতেন
শিক্ষক বলেছিলেন ওহে ঠাঁই নেই ছোটতরীর মানে
নরম নদীর নারী সোনাগাছি নিয়নে থাকুন
নদী থাক গলাটেপা বাঁধের বেড়ায় বাঁধা
হরিণ ঝুলতে থাক শিকারীর রঙিন দেয়ালে শিং তুলে
জোনাকিরা চলে যাক ফিনফিনে এনডোসালফিনে
আমলোকি গলে যাক রামদেব-আশ্রমের চিমচিমি-মোড়কে
শহরে আর আঁস্তাকুড়েরও জায়গা নেই
বলেনিকো কেউ ? কবির রহিম দাদু কৃত্তিবাস
কাশিরামদাস ময়মনসিংহী গান লেখকেরা ?
এত কবিতার বই এত কবিদের লেখা শ্বাস-প্রশ্বাস


ওরই নামের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে থাকবে আঁস্তাকুড়
কলেজ স্ট্রিটের পথে ডাস্টবিনে ফেলে-দেয়া ভ্রুণ
থাকবে ধাপার মাঠ শহরের জঞ্জালের বিরাট পাহাড়
নামের ভেতর মৃদু হাওয়া নয় নশ্বর অবিশ্রাম ঝড়...

( শব্দপাঠ পত্রিকার চতুর্দশ সংখ্যা ২০১১-এ প্রকাশিত )

মঙ্গলবার, ২ আগস্ট, ২০১১

৬৫টি হাইকু


অঙ্কের দোষ
সাধক কবিও লেখে
মাত্রা গুনে গুনে

ফেসবুক আছে
অরকুট টুইটার আছে
তবু থাকে একাকীত্ব


ভূমাধ্যাকর্ষণ
আলো ও ক্যালকুলাস---
নারীদেহ ছোঁননি নিউটন
 ৪
বসন্তে মৌমাছি
আফিমের ফুল থেকে
মাদক পেল না

শীতকাল--
কোথায় পোশাক রাখল
স্বপ্নের নগ্ন যুবতী
 ৬
সকলেই জানে টাকমাথা
কবিটি মিথ্যাচারী এবং অসৎ
তাই বলে ওনার গবেষকও

ব্যায়াম ব্রেকফাস্ট ভিড়
অফিস ভিড় বাড়ি টিভি সঙ্গম
মাসে লাখ টাকা

শুধু শোনো
বন্ধ রাখো মুখ
কমরেডগণ

ক্যাটরিনা কাইফ
জানেন সুন্দরী নিজে
চোখের নকল পাতা কেন
 ৯
কটা বেজেছে
জানতে চায় লোকটা
এক মুহূর্ত থেমে যায় পৃথিবী
১০
খরার খেতের মাঠ--
হাজার হাঁ-মুখ খুলে রূপসী বাংলা
নিঃশব্দে হাসছেন অট্টহাসি
১১
মলে ও মার্কেটে
দল বেঁধে ঘোরে যুবতীরা
স্বপ্নে শুধুই একজন
১২
মরা গাছ
নিজেকে নিয়েই সুখী
বৃষ্টি বাদলায়
১৩
সেলফোন--
রঙিন নানান গেমখেলা
বিদেশী নারীর কন্ঠ
১৪
এক দশক বন্দুকে
আঁকাআঁকি কবিতায় আরেকটি
ব্যবসার পাট কবে হবে
১৫
চরসের ধোঁয়া---
স্মৃতি থেকে অতীত ও বর্তমান
মুছে ফেলল কাশ্মিরী বালক
১৬
যে কবিরা
রাজনেতাদের সাথে ঘোরে
সংসারেও রাজনীতি করে
১৭
নগ্ন নারীদেহ
কতবার দেখেছে ফেরারি
ধারাবাহিক হত্যা করে তবু
১৮
শোপ্যাঁ...শোপ্যাঁ...
ডানা বাজাচ্ছে ঝিঁঝিঁ
শ্রাবণ সন্ধ্যায়
১৯
একা থাকে
কথা কইতে চায় না
খারাপ হবে কেন
২০
আওয়াজ...
বাজির আলো
জড়িয়ে ধরার সুযোগ
২১
পাকা বটফল টুপটাপ
মাটি থেকে তুলে নিলেন গৌতমবুদ্ধ
অসুস্থ কাঠবিড়ালি
২২
ওপারে তাজমহল
শাজাহান দেখছেন দূষণে নোংরা মার্বেলপাথর
কালো তাজমহল এলো
২৩
পাক খেয়ে উঠছে শাড়ি
নারী অঙ্গের বাঁকে নেচে উঠছে
মরা পলুপোকা
২৪
চিনিমুখে পিঁপড়েরা
আখগাছের গোড়ায় সুখের বাসা পিঁপড়ের
চাষির কাস্তে
২৫
ঘুণপোকার উন্নতি
ভালো বা খারাপ সময়টা যারই হোক যাই হোক
মহামহিম মহামহিম
২৬
লোডশেডিঙের গ্রীষ্ম
এমনকী দেশি পোষা কুকুররাও ডাকছে
ঝরঝরে তুষার
২৭
পুরুষ শাঁখ: কে বেশি সুন্দরী?
মাদি শাঁখ নাকি শাঁখা-রুলি পরা বউটি!
কলম হারিয়েছে
২৮
বালিতে জুতোর দাগ
বর্ষা এলে বাঁকবদল চায়নি নদী
শরতের খরা
২৯
পথে পায়রার ঝাঁক
থলে থেকে গম উপুড় করে গেছেন ব্যবসায়ী
ভিখারির কাশি
৩০
আমাদের শান্তি....নিকেতন
ফুল ও শাড়ির রঙে বসন্তের নাচ
ওপচানো ট্রেন
৩১
পাতালপুরীতে ফাল্গুন
দরজায় কড়া নাড়ছে মৌরলাঝাঁক
মেয়েটির ভাসমান লাশ
৩৩
যতটুকু ঝুঁকে দেখা
বাতাসে ছড়ানো আকাশ
ল্যাজের রক্তাভ আলো
৩৪
কোমরে হাত মেয়েটি
সম্রাট অশোক কাঁদছেন
কালো ঠান্ডা পাথর
৩৫
মেঠোপথে লাশ
লেবু পাতায় সবুজ টুপটাপ
স্যাঁতসেঁতে ঘাসফড়িং
৩৬
সুন্দরী পাতার রস
রক্তাক্ত হাত ছেলেটির
মৌয়ালিরা ফিরছে মধু নিয়ে
৩৭
শ্মশানে ধোঁয়ার কুন্ডলী
জলে চিংড়ি মাছের ঝাঁক
গৌতমবুদ্ধ হেঁটে গেলেন
৩৮
হাসছে বুড়ো লোকটির ভুঁড়ি
আমের গাছে লাল-হলুদ
কেউ একজন চুমু খেল
৩৯
শিমুলগাছে কোকিলের গান
আঁস্তাকুড়ে ভিড় বাড়ছে
কবিরদাস দোহা গাইতে-গাইতে গেলেন
৪০
বর্ষার প্রথম সকাল
বারান্দায় বাবার চটিজোড়া
ডাকপিওনের হাঁক
৪১
মুম্বাইয়ের তিরিশতলায়
নাকতলার গলি
কুকুরের পেছনে ছোঁড়ারা
৪২
ছাদে কাপড় মেলছে বউটি
দড়িতে ঘুড়ি আটক
দুপুরের গান
৪৩
দ্রুতিমেদুর শ্বেতাঙ্গিনীরা
অকেজো কমপিউটার
মেকানিকের মুঠোয় তিনগুণিতক
৪৪
আকাশে ২৩৮ প্রার্থনায়
পিছলে গেলেন ইষ্টদেবরা
পেট্রলগন্ধী দাউ-দাউ
৪৫
দিশি বন্দুকের ফটকা
আলকুশির রোঁয়া
উড়ছে। গোলা পায়রার ঝাঁক
৪৬
শিশির ভেজা ঘাসে
আজ সবুজ পায়ের দাগ
বৈরাগির দোতারায় সন্ধ্যা
৪৭
খুপরির অন্ধকার দিকটিতে
পিছন ফিরে পূর্ণিমা
ভিখারিণীর নোয়া
৪৮
জ্বলন্ত শহরের ছাইয়ে
গ্রিক সেনাপতি মিনান্ডার। পাটুলিপুত্রে
নাগার্জুন ধুলো মাখছেন
৪৯
কুয়াপুজোয় নাচছে হিজড়েরা
রাধেশ্যাম রাধেশ্যাম
কেঁদে উঠলো নতুন মানুষ
৫০
আঙিনায় থই-থই
ঝলমলে খিচুড়ির অমলতাস
প্রগাঢ় চোখমুখ
৫১
গোধুলি লগ্নের পানের বরজে
অশ্রুসজল রুমাল
বিসমিল্লা খান
৫২
জুজুধান ঝড়ে বনজ
মণিপদ্মে গোণ্ড-মুর্মু-ওঁরাও; উনি
অশথ্থ গাছের তলায় চোখ বুজলেন
৫৩
একটি মৃতদেহ
সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলে আছে
পুরুষ মাকড়সা
৫৪
দুরুদুরু শ্মশান
সাজানো কাঠের ওপর চোখ বুজে
ছানাসহ কুকুর
৫৫
শ্রাবণের দ্বৈরথে ফ্ল্যাটবাড়ি
দেড়শো বছর লড়ে পড়ে গেল
পায়রারা পথে
৫৬
চোরেদের স্মৃতি
রবীন্দ্রনাথের চটি রয়েছে শোকেসে
মাপে বড্ডো বড়
৫৭
রক্তাক্ত কৃষক
ঝুঁকে আছে ধানের শীষ
অস্থির মাঠে
৫৮
মহাষ্টমী
গরদ-নোলক গৃহিনী
হাতে ব্ল্যাকবেরি
৫৯
রূপোলি টাকা
সিঁদুর মাখা
বৃষ্টির অপেক্ষায়
৬০
তৃতীয় বউকে নিয়ে
প্রথম ট্রামে
মৌলভি যুবক
৬১
চৈত্রের বাতাস
নিখুঁত চাঞ্চল্য
যুবতীর আঁচলে
৬২
পাকা আম
পাড়তে বারণ করছে
গ্রীষ্মের লুবাতাস
৬৩
সোজা গিয়ে বাঁদিকে
কানা গলির শেষে
প্রেমিকার শ্বশুরবাড়ি
৬৪
মাইকে বলিউডি গান
পোস্টারে মার্কস
বিশ্বকর্মা পুজো
৬৫
ওনার বিড়াল
আমার বাড়ির মাছ
তাঁর আনন্দ



মঙ্গলবার, ২৯ মার্চ, ২০১১

পোস্টমডার্ন আহ্লাদের কবিতা কাব্যগ্রন্হ থেকে

 দুটি বিশ্ব
আমরা তো জানি রে আমরা সেরে ওঠার অযোগ্য
তাই বলে বৃষ্টির প্রতিধ্বনিতে ভেজা তোদের কুচুটে ফুসফুসে
গোলাপি বর্ষাতি গায়ে কুঁজো ভেটকির ঝাঁক সাঁতরাবে কেন


তোদের নাকি ধমনীতে ছিল ছাইমাখা পায়রাদের একভাষী উড়াল
শুনেছি অন্ধের দিব্যদৃষ্টি মেলে গাবদাগতর মেঘ পুষতিস
বগলে গুঁজে রাখতিস গাধার চিল্লানিতে ঠাসা রোজনামচা
আর এখন বলছিস ভোটদান তো দানবীর কর্ণও করেননি


কে না জানে শববাহকরাই চিরকাল অমর হয়েছে
ঔরসের অন্ধকারে কথা বলার লোক পেলি না বলে
ঘড়িঘরহীন শহরে ওয়ান-শট প্রেমিকা খুঁজলি
কী রে তোদের কি ঠিক-ঠিকানা নেই না রক্তের দোষ
যে বলিপড়া আয়নায় চোপরদিন লোলচর্ম প্রতিবিম্ব পড়ে


ছি ছি ছি নিঃশ্বাস ফেলে সেটাই আবার প্রশ্বাস হিসেবে ফেরত চাস
আমি তো ভেবেছিলুম তোরা সন্দেহ করার অধিকার প্রয়োগ করবি
তা নয় সারা গায়ে প্রাগৈতিহাসিক চুল নিয়ে ঢুং ঢুং তুলো ধুনছিস


শুভেচ্ছা রইল তোরা যেন দুঃশাসনের হাত দুটো পাস
যা দিয়ে ধোঁয়ার দুর্গে বসে ফুলঝুরির ফিনকি গুনবি
২৭ এপ্রিল ২০০০


সম্প্রসারণ
আমার ডাক-নাম তো ফনকু, তাই নাজিমের আব্বু
আমায় ফনকার সাহেব বলে ডাকেন। স্কুলে যেতে দেখলেই
বলেন, 'আসসলাম ওয়ালেকুম ফনকার সাহেব।'
আমি বলি, 'ওয়েলকাম আসসলাম।'
উনি বলেন, 'অর্জ হ্যায়...।'
আমি বলি, 'ইরশাদ হো।'
উনি বলেন, 'মুলহাজা ফরমায়া যায় ।'
আমি বলি, 'ইরশাদ ইরশাদ ।'
উনি বলেন, 'মেরি তামির মেঁ মুজমার হ্যায় ইক সুরত
খরাব কি, হায়ুলা বর্ক ই খিরমান কা হ্যায় খুন ই গর্ম
দেহকান কা ।'
আমি বলি, 'বহুত খুব বহুত খুব, মরহাবা ।'
তারপর জিগ্যেস করি, 'এর মানে কী ?'
নাজিমের আব্বু বলেন, 'আরে মিয়াঁ, এ হল গালিব,
অত্যন্ত অপলকা, এর মানে করতে যেও না,
নষ্ট করে ফেলবে ।'
আমি বললুম, 'তাহলে আরেকটা শোনান।'
৩ জানুয়ারি ২০০১

রবিবার, ১৩ মার্চ, ২০১১

প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার


( এই কবিতাটির জন্য ১৯৬৪ সালে মলয় রায়চৌধুরীর বিরুদ্ধে মকদ্দমা করেছিল তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গ সরকার। মলয়ের হাতে হাতকড়া পরিয়ে ও কোমরে দড়িবেঁধে প্রথমে থানায় এবং থানা থেকে ছয়-সাতজন অপরাধীর সঙ্গে রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে কোর্টে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। মলয়ের বিরুদ্ধে ৩৫ মাস মামলাটি চলে প্রথমে নিম্ন আদালতে, যেখানে মলয়ের একমাস জেলের সাজা ঘোষিত হয় ও তারপর কলকাতা উচ্চ আদালতে, যেখানে তিনি বেকসুর ছাড়া পান। মলয়ের পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন তরুণ সান্যাল, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, জ্যোতির্ময় দত্ত, সত্রাজিৎ দত্ত ও অজয় হালদার। পাঠকের হয়ত আশ্চর্য লাগবে, মলয়ের বিরুদ্ধে পুলিসের পক্ষের সাক্ষী ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ও উৎপলকুমার বসু। দুজন পুলিস ইনফর্মার, পবিত্র বল্লভ ও সমীর বসু, ছিলেন পুলিসের ভুয়ো সাক্ষী, যাঁরা মলয়ের পরিচিত না হওয়া সত্ত্বেও কোর্টে জানান যে মলয়ের সঙ্গে তাঁদের বহুবার কফিহাউসে দেখা হয়েছে। সবচেয়ে লজ্জার যে দুজন হাংরি আন্দোলনকারী রাজসাক্ষী , অর্থাৎ অ্যাপ্রুভার, হয়ে মলয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন; তাঁরা দুজন হলেন শৈলেশ্বর ঘোষ ও সুভাষ ঘোষ।এঁদের সাক্ষ্যের কারণেই নিম্ন আদালত মলয়কে সাজা দিয়েছিল ।)


ওঃ মরে যাব মরে যাব মরে যাব
আমার চামড়ার লহমা জ্বলে যাচ্ছে অকাট্য তুরুপে
আমি কী কোর্বো কোথায় যাব ওঃ কিছুই ভাল্লাগছে না
সাহিত্য-ফাহিত্য লাথি মেরে চলে যাব শুভা
শুভা আমাকে তোমার তর্মুজ আঙরাখার ভেতর চলে যেতে দাও
চুর্মার অন্ধকারে জাফ্রান মশারির আলুলায়িত ছায়ায়
সমস্ত নোঙর তুলে নেবার পর শেষ নোঙর আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে
আর আমি পার্ছি না, অজস্র কাঁচ ভেঙে যাচ্ছে কর্টেক্সে
আমি জানি শুভা, যোনি মেলে ধরো, শান্তি দাও
প্রতিটি শিরা অশ্রুস্রোত বয়ে নিয়ে যাচ্ছে হৃদয়াভিগর্ভে
শাশ্বত অসুস্হতায় পচে যাচ্ছে মগজের সংক্রামক স্ফুলিঙ্গ
মা, তুমি আমায় কঙ্কালরূপে ভূমিষ্ঠ করলে না কেন ?
তাহলে আমি দুকোটি আলোকবষহ ঈশ্বরের পোঁদে চুমো খেতুম
কিন্তু কিছুই ভলো লাগছে না আমার কিচ্ছু ভালো লাগছে না
একাধিক চুমো খেলে আমার গা গুলোয়
ধর্ষণকালে নারীকে ভুলে গিয়ে শিল্পে ফিরে এসেছি কতদিন
কবিতার আদিত্যবর্ণা মূত্রাশয়ে
এসব কী হচ্ছে জানি না তবু বুকের মধ্যে ঘটে যাচ্ছে অহরহ
সব ভেঙে চুরমার করে দেব শালা
ছিন্নভিন্ন করে দেব তোমাদের পাঁজরাবদ্ধ উৎসব
শুভাকে হিঁচড়ে উঠিয়ে নিয়ে যাব আমার ক্ষুধায়
দিতেই হবে শুভাকে
ওঃ মলয়
কোল্কাতাকে আর্দ্র ও পিচ্ছিল বরাঙ্গের মিছিল মনে হচ্ছে আজ
কিন্তু আমাকে নিয়ে আমি কী কোর্বো বুঝতে পার্ছি না
আমার স্মৃতিশক্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে
আমাকে মৃত্যুর দিকে যেতে দাও একা
আমাকে ধর্ষণ ও মরে যাওয়া শিখে নিতে হয়নি
প্রস্রাবের পর শেষ ফোঁটা ঝাড়ার দায়িত্ব আমায় শিখতে হয়নি
অন্ধকারে শুভার পাশে গিয়ে শুয়ে পড়া শিখতে হয়নি
শিখতে হয়নি নন্দিতার বুকের ওপর শুয়ে ফরাসি চামড়ার ব্যবহার
অথচ আমি চেয়েছিলুম আলেয়ার নতুন জবার মতো যোনির সুস্হতা
যোনোকেশরে কাঁচের টুকরোর মতন ঘামের সুস্হতা
আজ আমি মগজের শরণাপন্ন বিপর্যয়ের দিকে চলে এলুম
আমি বুঝতে পার্ছি না কী জন্যে আমি বেঁচে থাকতে চাইছি
আমার পূর্বপুরুষ লম্পট সাবর্ণচৌধুরীদের কথা আমি ভাবছি
আমাকে নতুন ও ভিন্নতর কিছু কোর্তে হবে
শুভার স্তনের ত্বকের মতো বিছানায় শেষবার ঘুমোতে দাও আমায়
জন্মমুহূর্তের তীব্রচ্ছটা সূর্যজখম মনে পড়ছে
আমি আমার নিজের মৃত্যু দেখে যেতে চাই
মলয় রায়চৌধুরীর প্রয়োজন পৃথিবীর ছিল না
তোমার তীব্র রূপালি য়ূটেরাসে ঘুমোতে দাও কিছুকাল শুভা
শান্তি দাও, শুভা শান্তি দাও
তোমার ঋতুস্রাবে ধুয়ে যেতে দাও আমার পাপতাড়িত কঙ্কাল
আমাকে তোমার গর্ভে আমারই শুক্র থেকে জন্ম নিতে দাও
আমার বাবা-মা আন্য হলেও কি আমি এরকম হতুম ?
সম্পূর্ণ ভিন্ন এক শুক্র থেকে মলয় ওর্ফে আমি হতে পার্তুম ?
আমার বাবার অন্য নারীর গর্ভে ঢুকেও কি মলয় হতুম ?
শুভা না থাকলে আমিও কি পেশাদার ভদ্রলোক হতুম মৃত ভায়ের মতন ?
ওঃ বলুক কেউ এসবের জবাবদিহি করুক
শুভা, ওঃ শুভা
তোমার সেলোফেন সতীচ্ছদের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীটা দেখতে দাও আমায়
পুনরায় সবুজ তোশকের ওপর চলে এসো শুভা
যেমন ক্যাথোড রশ্মিকে তীক্ষ্ণধী চুম্বকের আঁচ মেরে তুলতে হয়
১৯৫৬ সালের সেই হেস্তনেস্তকারী চিঠি মনে পড়ছে
তখন ভাল্লুকের ছাল দিয়ে সাজানো হচ্ছিল তোমার ক্লিটোরিসের আশপাশ
পাঁজর নিকুচি করা ঝুরি তখন তোমার স্তনে নামছে
হুঁশাহুঁশহীন গাফিলতির বর্ত্মে স্ফীত হয়ে উঠছে নির্বোধ আত্মীয়তা
আ আ আ আ আ আ আ আ আ আঃ
মরে যাব কিনা বুঝতে পার্ছি না
তুল্কালাম হয়ে যাচ্ছে বুকের ভেতরকার সমগ্র অসহায়তায়
সব কিছু ভেঙে তছনছ করে দিয়ে যাব
শিল্পের জন্যে সক্কোলকে ভেঙে খান-খান করে দোব
কবিতার জন্যে আত্মহত্যা ছাড়া স্বাভাবিকতা নেই
শুভা
 আমাকে তোমার লাবিয়া ম্যাজোরার স্মরণাতীত অসংযমে প্রবেশ কোর্তে দাও
দুঃখহীন আয়াসের অসম্ভাব্যতায় যেতে দাও
বেসামাল হৃদয়বত্তার স্বর্ণসবুজে
কেন আমি হারিয়ে যাইনি আমার মায়ের যোনিবর্ত্মে ?
কেন আমি পিতার আত্মমৈথুনের পর তাঁর পেচ্ছাপে বয়ে যাইনি ?
কেন আমি রজোস্রাবে মিশে যাইনি শ্লেষ্মায় ?
অথচ আমার নীচে চিত আধবোজা অবস্হায়
আরামগ্রহণকারিণী শুভাকে দেখে ভীষণ কষ্ট হয়েছে আমার
এরকম অসহায় চেহারা ফুটিয়েও নারী বিশ্বাসঘাতিনী হয়
আজ মনে হয় নারী ও শিল্পের মতো বিশ্বাসঘাতিনী কিছু নেই
এখন আমার হি২স্র হৃৎপিণ্ড অসম্ভব মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে
মাটি ফুঁড়ে জলের ঘূর্ণি আমার গলা ওব্দি উঠে আসছে
আমি মরে যাব
ওঃ এসমস্ত কী ঘটছে আমার মধ্যে
আমি আমার হাত হাতের চেটো খুঁজে পাচ্ছি না
পায়জামায় শুকিয়ে-যাওয়া বীর্য থেকে ডানা মেলছে
৩০০০০০ শিশু উড়ে যাচ্ছে শুভার স্তনমণ্ডলীর দিকে
ঝাঁকে-ঝাঁকে ছুঁচ ছুটে যাচ্ছে রক্ত থেকে কবিতায়
এখন আমার জেদি ঠ্যাঙের চোরাচালান সেঁদোতে চাইছে
হিপ্নোটিক শব্দরাজ্য থেকে ফাঁসানো মৃত্যুভেদী যৌনপর্চুলায়
ঘরের প্রত্যেকটা দেয়ালে মার্মুখি আয়না লাগিয়ে আমি দেখছি
কয়েকটা ন্যাংটো মলয়কে ছেড়ে দিয়ে তার আপ্রতিষ্ঠিত খেয়োখেয়ি
( হাংরি বুলেটিন, ১৯৬৪ )

                                              শুভা
 



                                                                                                        




শনিবার, ১২ মার্চ, ২০১১

যা লাগবে বলবেন কাব্যগ্রন্হ থেকে

যা লাগবে বলবেন
কে চেল্লায় শালা
কে চেল্লায় এত ভোরবেলা ?

গু-পরিষ্কার করেনি কাকেরা
মাছের বাজার থেকে ফেরেনি সবুজ মাছরাঙা
বকজোড়া আপিস যায়নি এখুনও !

কে চেল্লায়
কে চেল্লায়, অ্যাঁ, কিসেরি-বা রেলা ?

আমি, আমি, হাহ
আমিই আওয়াজ দিচ্ছি
চ্যাঁচাচ্ছি আমি
কোনোই বক্তব্য নেই
কোনোই কারণ নেই স্রেফ
চিৎকারের জন্যে চিৎকার
চিৎকারের ভেতরে চিৎকার

দ্রোহ
এ-নৌকো ময়ূরপঙ্খী
তীর্থযাত্রী
ব্যাঁটরা থেকে যাবে হরিদ্বার

এই গাধা যে-দিকে দুচোখ যায় যায়
যাযাবর
ঘাট বা আঘাটা যেখানে যেমন বোঝে
ঘুরতে চাই গর্দভের পিঠে
মাথায় কাগুজে টুপি মুখে চুনকালি
পেছনে ভিড়ের হল্লা।

সোমবার, ৭ মার্চ, ২০১১

আত্মধ্বংসের সহস্রাব্দ কাব্যগ্রন্থ থেকে

কী বিষয় কী বিষয়
      আররে রবীন্দ্রনাথ
তোমার সঙ্গেই তো নেচেছিলুম সেদিন
আঙুলের ইতিহাসে একতারার হাফবাউল ড়িং ড়াং তুলে
ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের জমঘট থেকে সদর স্ট্রিটের লবঙ্গবাজারে
যেতে-যেতে তুমি বললে আমাগো শিলাইদহ থিকা আসতাসি
আলুমুদ্দিন দপতর যামু

          আগুন আর জলের তৈরি তোমার ঠোঁটে
তখনও একচিলতে ব্রহ্মসঙ্গীত লেগেছিল কী গরম কী গরম
গ্যাবার্ডিনের আলখাল্লা ফেলে দিলে ছুঁড়ে
দেখলুম তোমার ফর্সা গায়ে জোঁক ধরেছে
বড়ো জোঁক বর্ষার জোড়াসাঁকোয়

        সেলিমের দোকানে শিককাবাবের গন্ধে
নেড়েগুলা কী রান্ধতাসে ? জানতে চাইলে
ও বললে, না বুঝলুঁ ? সাঁড়কে ছালন ছে !
আহাঁ দেখুঁ না চখকে

        চায়ের ঠেকে টাকমাথা চুটকি দাড়ি 
ভ্লাদিমির ইলিচ আর সোনালিচুল ভেরা ইভানোভা জাসুলিচ
আর তোমার মতন রুপোলি দাড়িতে অ্যাক্সেলরদ আর মারতভ যার গাল আপনা-আপনি কাঁপছিল দেখে 
তুমি বললে, উয়াদের ধড়গুলা কুথায় ?

        আমি আমার নাচ থামাতে পারছিলুম না বলে তুমি নিজের একতারাটা দিতে চাইলে কেননা তোমার পা থেকে নাচ যে পেরেছে খুলে নিয়ে গেছে
আর এখন তো দিনের বেলাও হ্যালোজেন জ্বলে
কী আনন্দ কী আনন্দ

        সদর স্ট্রিটের বারান্দায় 
তোমার তিনঠেঙে চেয়ারখানা পড়ে আছে
হুড়োহুড়ি প্রেম করতে গিয়ে পায়া ভেঙে ফেলেছিলে
তারিখ-সন লেখা আছে জীবনস্মৃতিতে
কী ভালোবাসা কী ভালোবাসা

        তোমার ফিটনগাড়ির ঘোড়া তো
কোকিলের মতন ডাকছে দাদু রবীন্দ্রনাথ
আর তোমার বীর্যের রেলিক্স থেকে কতজন যে পয়দা হয়েছিল মাটি থেকে ছোলাভাজা তুলে খাচ্ছে

        ওগুলা কী ? আমি বললুম কাক;
ওগুলারে কী কয় ? আমি বললুম সেলিমকেই জিগেস করো
ও এই অঞ্চলে তোলা আদায় করে ।
কী ঐশ্বর্য কী ঐশ্বর্য
২৪ আগস্ট ১৯৯৯

আমি ভঙ্গুর হে
    আমি যে-নাকি গাইডের কাছে ইতিহাস-শেখা ফোস্কাপড়া পর্যটক
ছায়ায় হেলান-দেয়া বাতিস্তম্ভের আদলে গিসলুম পিতৃত্ব ফলাবার ইসকুলে
জানতুম যতই যাই হোক ল্যাজটাই কুকুরকে নাড়ায় রে

    আমি যে-নাকি প্ল্যাটফর্মে ভবিষ্যভীতু কনের টাকলামাথা দোজবর
বস্তাপ্রতিম বানিয়ার বংশে এনেছিলুম হাইতোলা চিকেন চাউনি
কাদাকাঙাল ঠ্যাঙ থেকে ঝরাচ্ছিলুম ঘেসো ঝিঁঝির সাম্ভানাচ

    আমি যে-নাকি ফানুসনাভি ব্যাঙ থপথপে শুশুকমাথা আমলা
মাটিমাখা নতুন আলুর চোখে-দেখা দু'টাকা ডজন রামপ্রসাদী জবা
চাষির ঢঙে বলদ অনুসরণ করে পৌঁছেছিলুম বিধানসভার কুয়োতলায়

    আমি যে-নাকি পোলকাফোঁটা পুঁইফুলে দু'ভাঁজ করা হেঁইয়োরত বাতাস
ঢেউ-চাবকানো ঝড়ে যখন বঁড়শি-খেলা পুঁটির পাশে ভাসছি
তখন বুঝলি লম্বালম্বি করে কাটা কথাবাত্রার লাটিমছেঁড়া ঘুড়ি

আমি যে-নাকি ভূতলবাহী আওয়াজ-মিস্ত্রি হলদে-ল্যাঙোট বাবুই
চোখে-চোখে শেকল আঁকা ভিড়ের মধ্যে এঁদো বিভাগের কেঁদো
চি২ড়ি-দাড়া আঙুল দিয়ে খুলছি বসে জটপাকানো মুচকি ঠোঁটের হাসি 
৯ জুন ১৯৯৮ 

হার্টঅ্যাটাক
     বঁড়শিঝোলানো রোদকিলবিলে নদীর টুকরো থেকে
এক হ্যাঁচকায় তরল অভিকর্ষ বাতাসে খেলিয়ে ফ্যাকাশে আগুনের পুরুষ
এই মালগাড়ি-ঘ্যানঘ্যানে গ্রামের গল্ফ-সবুজ দুপুরে বসে রইল কচুপাতায়
ভ্রাম্যমাণ জলফোসকার দিকে তাকিয়ে

     তখন ওর কন্ঠার ঘামফোঁটা বুকের লোমে
ব্রেইল লিখনে আঙুল বুলিয়ে হাওয়া মাড়াবার নিঃশব্দ আওয়াজ তুলে নামছে
আর ঝাঁকড়ামাথা কুয়াশায় নাচতে লাগল রোদ্দুরের গন্ধে কাহিল ঝুলশিল্পী
মাকড়সার ইঁদুর-কালচে দলবল বন্ধ করতে ভুলে-যাওয়া দরোজার
তাড়া-খাওয়া সুড়ঙ্গে হাওয়ার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল মোমশিখার উদোম হাতছানি
ক্রমশ আঁটি শক্ত করতে শাঁস আলগা করে দিচ্ছিল গোলাপখাস
১৬মার্চ ১৯৯৮
  

শনিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১১

প্রেমের কবিতা

  ( এই কবিতাগুলো হাংরি আন্দোলনের কবিতা নয়। হাংরি আন্দোলন শেষ হয়ে যাবার বহু পরে এগুলো লখনউতে থাকতে লেখা )


দালাল
এ কী কুলনারী তুমি জাহাজঘাটায় দেহ বেচতে এসেছো
        লুঙিপরা পানখোর দালাল রাখোনি
সাদাপোশাকের কবি শরীর ঝাঁঝরা করে দেবে
শাঁখা-নোয়া খুলে তারা দু'হাত হিঁচড়ে টেনে তুলবে লরিতে
লকাপে ল্যাংটো মাঝরাত---সে সময়ে গেয়ো তুমি রবীন্দ্রসঙ্গীত

ছিহ কুলখুকি তুমি সবায়ের আদর কুড়োও
যার-তার সাথে গিয়ে যেখানে-সেখানে শুয়ে পড়ো
চারিদিকে কটাচোখো ধ্রুপদি জোচ্চোর সব নজর রাখছে মনে রেখো

আমি তো স্ট্রেচারবাহী কিছুই করতে পারব না
হয়তো টিফিন-বাক্সে এনে দেব রুটি আর আলুজিরে ভাজা
    গান শোনাবার মাঝে ঝুঁকে ঝুঁকে পয়সা কুড়োবে
ভোর হলে গঙ্গার পাড়ে তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বমি কোরো
    হাসপাতালেতে পাবে বেডপ্যান গ্লুকোজ বোতলে জল
তেলছিটে বিছানায় পাশে শোয়া ঘুমন্ত কুকুর।
 ( ১৭ অঘ্রাণ ১৩৯২ )

শুদ্ধ চেতনার রহস্য
ঠিক আছে, লাফাও
অ্যালুমিনিয়াম-ফ্রেম কাচের জানালা খুলে কুড়ি তলা থেকে
বাতাসে ঝাঁপাও তুমি টাঙাইল আঁচল উড়িয়ে
শূন্যে ভাসবে কালো ঢাল এলোকেশ
দুপায়ে অচেনা নাচে পৃথিবীর রঙিন মাটিতে
নেমে এসো তুমি
তখন খামচে দেখো হাওয়ার শরীর কীরকম
খেলবে তোমাকে নিয়ে ওলোট-পালোট
আমার পায়ের কাছে পড়ে তুমি ছত্রখান হও
খণ্ড-বিখণ্ড হাড় থ্যাঁতা-মাংস নাড়িভুড়ি সব একাকার
ঠোঁট যোনি উরু নাভি পাছা স্তন আলাদা অস্তিত্ব নিয়ে
সৌন্দর্য-বিমূর্ত ক্বাথে মাছির খোরাক হবে তুমি
সব জড়ো করে তবু তুমি নও
তুমি সেসময়ে রৌদ্রে ভাসমান
বুঝেছিলে মিথ্যে এই অধঃপতন। 
২১ আষাঢ় ১৩৯২ 

দোটানা
ফেরার সময় ওরা ঘিরে ধরে। ছ'সাতজন। প্রত্যেকরই
রয়েছে কিছু-নাকিছু হাতে। আসার সময় জানতুম আজ
গোলমাল হবে তাই তৈরি হয়েই এসেছি। তবু প্রথমেই
নিজের তরফ থেকে হাত ওঠাবব না, সেটা ঠিক করা আছে।
জামার কলার ধরে একজন খিস্তি করে, 'পরেম করতধে এয়েচো
এপাড়ায়! কেন? নিজের বাড়িতে মাগ নেই নাকি।'

দাঁতে দাঁত দিয়ে মাথা ঠাণ্ডা রাখি। তখনই চোয়ালে ঘুষি
রক্ত টেনে বের করে যেটা হাত দিয়ে টের পাই।
এক ঝটকায় ছাড়িয়েই বসে পড়ি। মোজার ভেতর থেকে
চকিতে বেরিয়ে আসে নতুন প্রজন্মের ক্ষিপ্র চিৎপুরি---
হ্যালোজেন-মাখা অন্ধকারে ঝলসে ওঠে স্টেনলেস চাকু
ফলায় 'ছিদাম' লেখা একপিঠে 'মাকালী' ওপিঠে।
জটলা ছিৎরে যায়। চাকু০-দেবতার নামে কতগুণ আছে
সকলে জানে না। মানব কেন অমন কুচুটে?
প্রেমিকের জন্য কোনো ভালোবাসা নেই? এই যে ছ'সাতজন
মনের স্বামিত্ব হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে বলে ঘিরে ধরেছিল
কেমন গুটিয়ে গেল চাউনির একটু ঝলকে !
২৯ আষাঢ় ১৩৯২ 

ছি কলকাতা
থাকো তুমি তোমার ওই হিজড়েদের নিয়ে
তুমি তো তাদের আয়া স্বপ্নে যারা বর্ষাকালে বিছানায় মোতে
ইজের বদল করো ঠ্যাঙ তুলে
ফড়েরা পেচ্ছাপ করবে বলে তুমি দেয়ালে মহৎকথা লেখো
তোমার ব্যাপারে আর থাকতে চাই না আমি
তোমাকে চুম্বন করলে মৃত্যুর পরেও জানি টকে থাকবে মুখ
যেও গিয়ে কেরানি বিপ্লব করো বি-বা-দী পাড়ায়
তোমার খুলির ফাঁকে কেবলই পয়সা ফেলতা ডাকো তুমি

আমি তো মনুষ্যতর দানো
অঙ্গপ্রত্যঙ্গে স্হিতিস্হাপকতা নিয়ে জাপটে পিষে দিতে পারি
পায়েতে পাথর বেঁধে ফেলে দিতে পারি এঁদো পুকুরে-ডোবায়
তোমার ঘরেতে ঢুকলে দালালের টোকা পড়বে দরোজায়
"জলদি সারো আরও দু'জন বায়না দিয়েছে।"
১৭ বৈশাখ ১৩৯২

বিজ্ঞানসম্মত কীর্তি
ফ্যান টাঙাবার ওই খালি হুক থেকে
কন্ঠে নাইলন দড়ি বেঁধে ঝুলে পড়ো
কপাট ভেজিয়ে দরোজার চুপিসাড়ে
উঁচুতানে রেডিও চালিয়ে তাড়াতাড়ি
শাড়িশায়া জামা খুলে টুলের ওপরে
দাঁড়িয়ে গলায় ফাঁস-রশি পরে নিয়ো
সারারাত অন্ধকারে একা ঝুলে থেকো
চোখ ঠিকরিয়ে জিভ বাইরে বেরোনো
দু'পাশে বেহুঁশ দুই বাহু আর স্তন
জমাট ষোড়শী শূন্য পায়ের তলায়
পৃথিবীর ধরা-ছোঁয়া ছাড়িয়ে যেখানে
বহু পুরুষের ঠোঁটে আদর খেয়েছো
সে-শরীর ছুঁতে ভয় পাবে তারা আজ

দোলো লাশ নামাবার জন্যে আছি আমি। 
১৯ শ্রাবণ ১৩৯২

শিল্পোন্নয়ন
এ খি তুমি এইখানে পাগলাগারদে
পায়েতে শেকলবাঁধা নেয়ারের খাতে
উদোম উলঙ্গ শুয়ে আছো চুলে জট
নোংরা নখ বেড়ে গেছে দু'চোখে ঢুলুনি
সারাঘর বমি মুত পায়খানা ভরা
ভাতমাখা এনামেল থালা এক কোণে
শরীর ধোওনি জলে নেমে কতদিন
চেনাই যায় না এক কালে পাঁচতারা
হোটেলে নেচেছো নাভি নিতম্ব কাঁপিয়ে

আরেকবার সুস্হ হও শুভ্রা রায়
নাচব সকলে তুর্কি গাঁজা ভাঙ টেনে
হাড়িয়া মহুল খেয়ে ফিরিঙি আদলে
উঠে এসো সুর্মা চোখে লুপুঙগুটুতে
বেবাক দুনিয়া যায় জাহান্নমে যাক।   
২১ শ্রাবণ ১৩৯২

 বাজারিনী
বিশ বছরের পর এলে তুমি। তোমার আদুরে ভাষা পালটে গিয়েছে
বারবার। জানি তুমি শুভ্রা রায় নও। ওরকমভাবে একঠায়ে
সারাদিন মাথা নিচু করে বসে থাকো। আমার চুলেতে পাক
ধরে গেছে। শেখাও তোমার ভাষা এইবার। দেখি কীরকম
ঠোঁট নড়ে নাভি খিলখিল কেঁপে হেসে কুটি হয়।যুবকেরা
ঘিরে থাকে বহুক্ষণ তোমায় আড়াল করে। কিসের কথা যে এধ হয়
কিছুই বুঝি না। অন্তত কুড়ি বছরের ছোট হবে তুমি।
জানি না কাদের জন্যে অন্ন আনাজ সংগ্রহে আজ এলোচুলে
নেমেছ বাজারে। লুবাতাসে রোদেপুড়ে কালো হয়ে যাবে শেষে।
তুমুল বৃষ্টির মাঝে কীভাবে বাসায় ফেরো? ওই যুবকেরা
ছাতা ধরে মাথার ওপরে? বাড়ি ফিরে ভিজে চুল বোধায় শোকাও একা।
সকালে কি রান্না করে আসো? সেগুলোই রাতে খাও?
শরীর খারাপ হলে কারা দ্যাখে ? কে কাপড় কাচে?

আমার সন্ত্রাসবাজি রাহাজানি লুটমারথেকে জানি তোমার দুনিয়া
আলাদা একদম। তোমাকে নিজের নাম বলতে পারি না আমি।
যদি ঘেন্না করো, জেনে যাও কী-কী করি, ভয় পাও।
কতদিন ইচ্ছে হয় সামান্য ইশারা করে আমার দলের লোকেদের
তোমাকে রাস্তা থেকে জোর করে তুলে নিতে বলি।
দাঁড়াবে আমার সামনে এসে তুমি। বলবে, 'আমাকে যেতে দিন'।
২৮ আষাঢ় ১৩৯২ 

পরবর্তী সর্বনাশ
পাহাড়ের বাঁকে ট্রেন দেখা গেছে যাও
এই বেলা ঘুমে অচেতন গৃহস্হালি
ফেলে ছোটো মাথা পেতে দিতে রেলপথে
এর পর রাতে আর কোনো ট্রেন নেই
পিষে কেটে ছ'টুকরো হয়ে যাও তুমি
শাঁখা-পলা গুঁড়ো হয়ে মিশুক মাটিতে
তলপেটে রাখা ভ্রুণ নিসর্গে ফিরুক
ট্রেনের পয়ার ছন্দে নিজেকে ভুলিয়ে
তোলপাড় করে দাও সুখের সংসার
ভয় দুঃখ শোক গ্লানি দিয়ে বন্ধ করো
অমল আনন্দ শেষ হোক ভাঙা ঘুমে
দধ'হাত বাড়িয়ে সারারাত রেলপথ
শিশির উপেক্ষা করে তোমার শরীর
পাবে বলে ঠায় জেগে আছে সন্ধে থেকে ।
২০ শ্রাবণ ১৩৯২ 

ধনতন্ত্রের ক্রমবিকাশ
শেষরাতে পাশ ধেকে কখন উঠেছ
চুপচাপ আলমারি ভেঙে কী অ্যাসিড
ঢকঢক করে গিলে মরছ এখন
আলজিভ খসে গেছে দু'গালে কোটর
মাড়িদাঁত দেখা যায় কষেতে বইছে
গাঢ় ফেনা হাঁটুতে ধরেছে খিঁচ ব্যথা
চুল আলুথালু বেনারসি শাড়ি সায়া
রক্তে জবজবে মুঠোতে কাজললতা
শোলার মুকুট রক্ত-মাখা একপাশে
কী করে করেছ সহ্য জানতে পারিনি
শুনতে পাইনি কোনো চাপা চিৎকার
তবে কেন সায় দিয়েছিলে ঘাড় নেড়ে
আমি চাই যে করেই হোক বেঁচে ওঠো
সমগ্র জীবন থাকো কথাহীন হয়ে
২২ শ্রাবণ ১৩৯১