মলয় রায়চৌধুরী

মলয় রায়চৌধুরী

সোমবার, ৪ মে, ২০২০

মাথা কেটে পাঠাচ্ছি, যত্ন করে রেখো

মাথা কেটে পাঠাচ্ছি, যত্ন করে রেখো
উৎসর্গ : সোনালী চক্রবর্তী
 
মাথা কেটে পাঠাচ্ছি, যত্ন করে রেখো
মুখ দেখে ভালোবেসে বলেছিলে, "চলুন পালাই"
ভিতু বলে সাহস যোগাতে পারিনি সেই দিন, তাই
নিজের মাথা কেটে পাঠালুম, আজকে ভ্যালেনটাইনের দিন
ভালো করে গিফ্টপ্যাক করা আছে, "ভালোবাসি" লেখা কার্ডসহ
সব পাবে যা-যা চেয়েছিলে, ঘাম-লালা-অশ্রুজল, ফাটাফুটো ঠোঁট
তুমি ঝড় তুলেছিলে, বিদ্যুৎ খেলিয়েছিলে, জাহাঝ ডুবিয়েছিলে
তার সব চিহ্ণ পাবে কাটা মাথাটায়, চুলে শ্যাম্পু করে পাঠিয়েছি
উলঙ্গ দেখার আতঙ্কে ভুগতে হবে না
গৌড়ীয় লবণাক্ত লিঙ্গ দেখবার কোনো স্কোপ আর নেই
চোখ খোলা আছে, তোমাকে দেখার জন্য সবসময়, আইড্রপ দিও
গিফ্টপ্যাক আলতো করে খুলো, মুখ হাঁ-করাই আছে
আমার পছন্দের ননভেজ, সন্ধ্যায় সিঙ্গল মল্ট, খাওয়াতে ভুলো না
মাথাকে কোলেতে রেখে কথা বোলো, গিটার বাজিয়ে গান গেও
ছ'মাস অন্তর ফেশিয়াল করিয়ে দিও, চন্দনের পাউডার মাখিও
ভোর বেলা উঠে আর ঘুমোতে যাবার আগে চুমু খেও ঠোঁটে
রাত হলে দু'চোখের পাতা বন্ধ করে দিও, জানো তো আলোতে ঘুমোতে পারি না
কানে কানে বোলো আজও উন্মাদের মতো ভালোবাসো
মাথা কেটে পাঠালুম, প্রাপ্তি জানিও, মোবাইল নং কার্ডে লেখা আছে

ছবিতে থাকতে পারে: 1 জন, ক্লোজআপ
 
 
 
 

সাজানো বাগানের পরের স্টপ

সাজানো বাগানের পরের স্টপ
উৎসর্গ : প্রবাল দাশগুপ্ত
 
নেশাগ্রস্তের মাথা ঝুঁকিয়ে জয়াধানের রুদ্ধদ্বার শিস ছেড়ে
মাঙ্গলিক সাজসজ্জায় উড়ছে প্রজাপতির ভাবুক ঝাঁক
ভালোবেসে বিয়ে করবে বলে একজোড়া খুন্তেবকের আকাশে
রাগতস্বরে আরম্ভ হয়ে গেছে অর্ধস্ফূট বৃষ্টি
আর মৃগেল গৃহবধূর সঙ্গে ভাসমান দীর্ঘদেহী কালবোসের ঘাটে
নীরবতা পালন করছে কুলাঙ্গার-অধ্যূষিত মহাশ্মশান
লাগোয়া রুগ্নকরুণ বাতাসে মোড়া সংশয়াচ্ছন্ন ষাঁড় -- ভদ্র বিনয়ী
মাধবীকঙ্কণ বাগানের পরেই এই ইকেবানা বাসস্টপ
দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে মুলো হাতে কয়েক দশকের কিউ ভেঙে
প্রেম আর মারামারিতে তফাত ধোঁয়াটে হয়ে আসছে
খাঁটিসত্য কঠিনসত্য রূঢ়সত্য গভীরতম সত্যের ভুলভুলাইয়ায়
আলোকপ্রাপ্তির ফুয়েল সারচার্য আগেই বাড়িয়েছে মিষ্টভাষী ঝিঁঝি
তখন সবে-দাড়িগোঁফ তরুণরা রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে ঘাম শুকোচ্ছিল
ভেতরে ভেতরে নিভছিল তুষবুকের অনির্ণেয় পূর্ণিমা
২৩ এপ্রিল ১৯৯৮

ছবিতে থাকতে পারে: Aloke Goswami, চশমা এবং দাড়ি
 
 
 
 

কাউন্টার ডিসকোর্স

কাউন্টার ডিসকোর্স
উৎসর্গ : যশোধরা রায়চৌধুরী
 
সমুদ্রের নোনাডাক লাগাতার বলছিল আমি আর আগের মতো নেই রে
নেই কেননা হাসপাতালে বিছানায় রেলিঙে আমার পা বেঁধে দেবার পর
খাটের দুপাশ দিয়ে আলাদা বয়ে যাচ্ছিল মজুরের নদী কৃষকের নদী
যে-কড়াকড়িতে সারাদিনে সূর্য শুধু একবারই ওঠে আর মিলিয়ে যায়
উদাহরণ দিতে হলে বলতে হয় এ তো ব্যাঙ আর কেউটের শুভদৃষ্টি
যখন বীজের আধভেজা খোসা শেষবার জড়িয়ে ধরেছে অঙ্কুরকে
.
আমি জানতুম আমি আর আগের মতো নেই রে সব শব্দেরই তালাখোলা শেষ
দিনকাল এমন পড়েছে যে গোলাপের গোড়ায় ঋষির হাড়গুঁড়ো না দিলে ফোটে না
আর কেউ শালা আকাশের এক কোণে পিক ফেলে কেটে পড়েছে
হতে পারে...হতে পারে...কাকতাড়ুয়ার ওপর বসে-থাকা দাঁড়কাকটা
.
আশ্বিন দুপুরের রোদে কাঁথাস্টিচ-করা পুকুরের জল থেকে
আমি ইয়ার নিজের শেষ ছায়াটুকু চাঁচপোঁছ করে তুলে নিয়েছি
৩০ মার্চ ২০০০

ছবিতে থাকতে পারে: 1 জন
 
 
 
 

আবু তাহের-এর মৃত্যু

আবু তাহের-এর মৃত্যু
উৎসর্গ : রবীন্দ্র গুহ
 
এক চুমুকে শেষ শালপাতার রোদ্দুরে
যাঁর এতো অভিজ্ঞতা ছুঁচে সুতো যায় না লিপ্সটিক-মাখা ঈশ্বরী
জঙ্গল পুড়িয়ে বসত এনেছে মর্ত্যে
শিশুকান্নার স্বরবর্ণ
খুঁজে-পাওয়া ফেরারির বেদম বেধড়কে হাতে গুঁজে দিয়েছিলেন
সবুজ বিদ্যুতের ঠাণ্ডা টুকরো
নৌ-জানোয়ারের মাতৃভাষায় পাওয়া চিন্তায়
ঘাসপোড়া ধিকিধিকি
.
মাছের ঝাঁকে ডুবে-মরা নায়িকার মুখে জড়ানো এলোচুল সরিয়ে
নীলচে ঝর্ণাধারার তোতলামিতে
বলেছিলেন, ‘আপনি আমাকে চিনবেন না’
যদিও পায়ের ছাপ মনে রেখেছিল শুকনো কাদা
রাত দশটার শীতে উপাসকের পালতোলা নৌকোয়
একলা মৃতদেহ
১৭ জুলাই ১৯৯৪
ছবিতে থাকতে পারে: 1 জন, টেক্সট
 
 
 

অ আ ক খ

অ আ ক খ
উৎসর্গ : সত্যপ্রিয় মুখোপাধ্যায়
 
খোসের নতুন গোলাপি চামড়া-মোড়া শোষ মোগলের রাজটোপর
একমুঠো বাতাসে পাঁচ-ছটা হাত ঝুঁকিয়ে কলাগাছ শিস দিয়ে ডেকেছে
কুকুর-শোঁকা কাঁকরপথের দাঙ্গা
পতনগণকের টিয়ার ঠোঁটে
চোখ-জুড়োনো মরুভূমিতে বিনোবার গনগনে হাড়
.
আস্তিনে গোটানো আধফোঁকা বিড়ির সঙ্গে স্তম্ভিত আত্মার গোঙানি
প্রার্থনাকে পালটেছে ভজনগানে
একটু-একটু করে চিবিয়ে খাওয়া আতপস্নানের গামছে
আয়না কাঁচের টুকরো বিঁধেছে খাবার নলিপথে
নিখিল - নিখিল অ আ ক খ
.
গুজরাতি নারীর বান্ধনি উড়ুনির অপ্রকাশিত জাহাজে ভেসেছে
ভ্রূণরসে চোবানো শহর
খুঁজে পাওয়া গেছে রক্তে বাঁ হাত আড়াল-করা প্রদীপে
সূর্য-ঠাশা ময়ূরপেখম-মুকুট মাথায় ঘাসমূল সন্ত
জীবন উৎসর্গ করেছেন বুলবুল পাখির ডিমের সবুজ ফুটকি সংগ্রহে
.
ধ্রুপদিগানে কোকিলের মুখবিকৃতি হচ্ছে না বলে
আলোর ইঁটে তৈরি আমিশাষী ফুলের হাঁ-মুখে পাল তুলেছে ছায়াপথ
যার দুধারে পিটিয়ে-লাশ করা দান্তে আর ভারজিলের খড়িফোটা নিসর্গ
ঝিনুক শিকারীর শীতশীতল হাতে
মেঘের জেলখানা থেকে ছাড়িয়ে-আনা মূল্যচ্যূত বৃষ্টি ।
১৭ অক্টোবর ১৯৯৩

ছবিতে থাকতে পারে: এক বা আরও বেশি ব্যক্তি
 
 
 
 

দোভাষী

দোভাষী
উৎসর্গ : সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত
 
জলোচ্ছ্বাসে যে -চিৎকার
তার আতঙ্কের নোনা
তাড়া করে ফিরেছে সবজিখেত
বেগুন লঙ্কা কাঁকরোল
বড্ড ধ্বনিহীন বজ্র
ঝঞ্ঝাবাতাসে বেগ নেই
আমিও চিৎকারে থাকি
ত্বরান্বিত করি তার ত্রাস
যারা নিরাশ্রয় ছিল
জেলে গিয়ে পেয়েছে আশ্রয়
পুকুরে পুকুর ভাসে
উজানের আলগাস্বভাবে
দুই পাহাড়ের মাঝে মধ্যস্হতা করে নামে নদী
২ ডিসেম্বর ১৯৯৪

ছবিতে থাকতে পারে: 1 জন, চশমা এবং ক্লোজআপ
 
 
 
 

কোম্পানি ল-বোর্ডের আদেশ

কোম্পানি ল-বোর্ডের আদেশ
উৎসর্গ : ঝুমা চট্টোপাধ্যায়

হুইল চেয়ারে লীন প্রেসনোটে যে-সংগীত জারি করা হল তারই নিচে
গাছে-ডালে ঝুলে আছে শুনানি না-করা মামলা থ্যাঙ্কিউসহ
.
প্রকরণ তিন-এর উপ-প্রকরণ বাদ দিয়ে, লাভাংশ ঘোষিত হবে
গোধূলি-বেলায়, এই সাধারণ সভা কোম্পানির পুরা-সময়ের পুত্রবধূ
.
ডিরেক্টর পদে আজ নির্বাসিত হবেন নিশীথে
অনাদায়ী বিছানায় থাকা-খাওয়া বিমান ভাড়া বা
.
স্ব-স্ব পদে যে যারা দাঁড়াবে তিনি বোর্ডরুমে এসে
কায়াটি মাটিতে ফেলে ৩১শে মার্চের সাড়ে পাঁচটার আগে
.
ইকুয়িটি শেয়ারের প্রথম কাগজখানা বাজারে ছাড়েন, ওরা পাবে
হলফনামার কপি বনপথে পাখির বাসার মাঝে যারা ফেলেছিল
১৯ জুন ১৯৯৬

ছবিতে থাকতে পারে: 1 জন, চশমা এবং ক্লোজআপ